কার্ল মার্কস ও ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস প্রবর্তিত ‘মার্ক্সবাদ’ একটি প্রভাবশালী আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক দর্শন। মার্কসবাদ একটি সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক তত্ত্ব। এর মূল লক্ষ্য হলো- পুঁজিবাদী ব্যবস্থার শোষণ থেকে শ্রমিকশ্রেণি তথা মেহনতী গণমানুষের মুক্তির পথ দেখানো এবং শ্রেণিহীন ও ধনবৈষম্যহীন সমাজতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা। আজকের বিশ্ব প্রেক্ষাপটে যা মানবমুক্তির সনদ হিসেবে স্বীকৃত। পৃথিবীর কোনো দর্শনচিন্তা-ই প্রশ্নের বা সমালোচনার উর্ধ্বে নয়। যত ভালো কিছুই হোকনা কেন, মার্ক্সবাদও শ্বাশত কোনো আপ্তবাক্য নয়। মার্ক্সবাদেরও সমালোচনা আছে এবং থাকবে। পৃথিবীর সকল মতবাদেরই বিরোধী মতবাদ আছে, তেমনই মার্ক্সবাদেরও বিরোধী মতবাদ আছে। তাছাড়া মার্ক্সবাদ বিরোধীরা মার্ক্সবাদের বিরোধিতা করবে এটা খুবই স্বাভাবিক। মার্ক্স এঙ্গেলস কর্তৃক রচিত এবং ১৮৪৮ সালে প্রকাশিত কমিউনিস্ট ইশতেহারের শুরুর দিকের মূল বাক্যটিতে বলা হয়েছে, “একটি ভূত ইউরোপকে তাড়া করে ফিরছে, কমিউনিজমের ভূত”।
সেই থেকে অদ্যাবধি বিশ্বব্যাপী কমিউনিজমের ‘ভুত’ তাড়াতে মার্ক্সবাদ বিরোধী অসংখ্য প্লাটফর্ম গড়ে উঠেছে। ফ্রাংফুট স্কুল বা ফ্রাংফুট ঘরানা- মার্ক্সবাদ বিরোধী তেমনই একটি অন্যতম প্রধান প্লাটফর্ম।
মার্ক্সবাদী তত্ত্বায়নের বিকশমাণ ধারাকে অব্যাহত রাখার নিমিত্তে বা স্বার্থে মার্ক্সবাদের গঠনমূলক সৃজনশীল সমালোচনা হওয়াটাও জরুরি। কিন্তু তার মানে যদি এই হয়, মার্ক্সবাদের সমালোচনার নামে মার্ক্সবাদকে-ই অস্বীকার করা, তবে সেটা নিশ্চয়ই মার্ক্সবাদীরা মানবে না।
সৃজনশীল মার্ক্সবাদীরা মনে করে, মার্ক্সবাদ কোনো স্থবির বা অপরিবর্তনীয় কোনো ধর্ম নয়, বরং এটি একটি সৃজনশীল বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব। পরিবর্তিত সময় ও সমাজের সুনির্দিষ্ট আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতির আলোকে তত্ত্বের সৃজনশীল প্রয়োগই মার্ক্সবাদের মূল কথা। এটি নতুন নতুন বাস্তবতাকে বিশ্লেষণ করে নতুন রণকৌশল নির্ধারণের পথ দেখায়। মার্ক্সবাদ কোনো মুখস্থ করার বিষয়ও নয়, এটি বরং কাজের পথনির্দেশক। কার্ল মার্কস ও ফ্রেডরিক এঙ্গেলস নিজেরাও তাঁদের জীবদ্দশায় তাঁদের দর্শনচিন্তাকে সময়ের সাথে পরিশীলিত করেছেন।
ভি.আই.লেনিন, মার্ক্সবাদের মর্মবস্তু গ্রহণ করে শিল্পে অপেক্ষাকৃত পশ্চাৎপদ রাশিয়ায় বৈপ্লবিক পরিস্থিতির উপযোগী করে একে সফলভাবে প্রয়োগ করেন, যা মার্ক্স-উত্তর যুগে তত্ত্বটির অন্যতম সেরা সৃজনশীল বিকাশ।
মার্কসীয় দর্শনের মূল নির্দেশনা হলো- সৃজনশীল বৈজ্ঞানিক চিন্তা। পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বিবর্তন, সাম্রাজ্যবাদ, এবং আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি ও বিশ্বায়নের নানা অনুসঙ্গকে ধারণ করে মার্ক্সবাদী চিন্তাধারা ক্রমাগত বিকশিত হচ্ছে এবং হতে থাকবে। প্রতিটি দেশের ভিন্ন ভিন্ন আর্থ-সামাজিক কাঠামোর ভিত্তিতে মার্ক্সীয় সূত্রের বিশ্লেষণ ও প্রয়োগ করতে হয়। তাত্ত্বিক গোঁড়ামি পরিহার করে নিজস্ব বাস্তবতার আলোকে রণকৌশল নির্ধারণই মার্ক্সবাদের সৃজনশীল চর্চা।
এবার আসা যাক, ফ্রাংকফুট ঘরানার সাথে মার্ক্সবাদের মৌলিক পার্থক্য কি?
ফ্রাংকফুট ঘরানা বা Frankfurt School এবং মার্ক্সবাদের মধ্যে প্রধান পার্থক্য হলো- ১) মার্ক্সবাদ মূলত অর্থনীতি, উৎপাদন ব্যবস্থা এবং শ্রমিক শ্রেণির বিপ্লবের ওপর জোর দেয়। অন্যদিকে ফ্রাংকফুট ঘরানা- সংস্কৃতি, শিল্প, গণমাধ্যম এবং মানুষের মনস্তাত্ত্বিক দিকের সমালোচনার মাধ্যমে পুঁজিবাদের আধিপত্য বোঝার চেষ্টা করে।
২) মার্ক্সবাদের মৌলিক আলোচনার ভিত্তি হলো- অর্থনীতি, পুঁজি, সম্পত্তির মালিকানা এবং বস্তুগত অনুসঙ্গ। অন্যদিকে ফ্রাংফুট ঘরানার আলোচনার ভিত্তি হলো- সংস্কৃতি, চেতনা, শিল্প, গণমাধ্যম এবং মতাদর্শগত উপরিকাঠামো (Superstructure)। ৩) মার্ক্সবাদী তত্ত্বমতে বিপ্লবের চালিকাশক্তি হচ্ছে, প্রলেতারিয়েত বা শ্রমিকশ্রেণি বা মেহনতী গণমানুষ। যাদেরকে কেন্দ্র করে গণঅভ্যুত্থান বা সশস্ত্র গণঅভ্যুত্থান বা বিপ্লবের মধ্যদিয়ে সমাজের বদল ঘটাতে চায়। অন্যদিকে ফ্রাংফুট ঘরানার তত্ত্বমতে বিপ্লবের চালিকাশক্তি- শ্রমিকশ্রেণি বা মেহনতী গণমানুষ নয় বরং বুদ্ধিজীবী ও সমালোচকরা। তারা পুঁজিবাদী সংস্কৃতির সমালোচনার মধ্য দিয়ে সমাজকে সচেতন করে রক্তপাতহীনভাবে সামাজের বদল আনতে চান।
৪) মার্ক্সবাদী তত্ত্বমতে- মার্ক্সবাদ সমাজ পরিবর্তনের একটি ‘বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব’ কিন্তু
ফ্রাংকফুট ঘরানার তাত্ত্বিকরা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকেও পুঁজিবাদের হাতিয়ার ও মানুষের ওপর নিয়ন্ত্রণের মাধ্যম হিসেবে দেখেন। ৫) মার্ক্সবাদে মনোবিজ্ঞানের চেয়ে অর্থনৈতিক শ্রেণীসংগ্রামকেই প্রধান হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয় কিন্তু ফ্রাংকফুট ঘরানা- মার্ক্সবাদের সাথে সিগমুন্ড ফ্রয়েডের মনোবিশ্লেষণ (Psychoanalysis) যুক্ত করেছেন, যা মানুষের অবচেতন মনের ভয় ও আকাঙ্ক্ষা কীভাবে পুঁজিবাদের মদদ দেয় তা ব্যাখ্যা করেছেন।
৬) মার্ক্সীয় তত্ত্ব অনুযায়ী- পুঁজিবাদকে অর্থনৈতিক শোষণ ও উদ্বৃত্ত মূল্যের তত্ত্বে বিশ্লেষণ করা হয়। অন্যদিকে ফ্রাংফুট ঘরানার বুদ্ধিজীবীরা- পুঁজিবাদের সমালোচনার পাশাপাশি গণসংস্কৃতি (Mass Culture) ও ভোগের মানসিকতা মানুষের চিন্তাশক্তিকে কিভাবে ধ্বংস করছে তা বিশ্লেষণ করে।
উপরোক্ত আলোচনাকে সংক্ষেপ করে যে সিদ্ধান্তে আসা যায় আর তা হলো, মার্ক্সবাদী তত্ত্ব অনুযায়ী- অর্থনৈতিক কাঠামোর পরিবর্তনের মাধ্যমেই সমাজ বদল সম্ভব। কারণ, একমাত্র অর্থনীতি-ই হচ্ছে সমাজ বা রাষ্ট্রের ভিত্তি কাঠামো বা অন্তঃ কাঠামো কিন্তু ফ্রাংকফুট ঘরানার চিন্তাবিদদের মধ্যে- থিওডোর অ্যাডোর্নো, হার্বার্ট মার্কুসের ধারণা, পুঁজিবাদ মানুষকে এতটাই মানসিক ও সাংস্কৃতিকভাবে পঙ্গু করে দিয়েছে যে, অর্থনৈতিক বিপ্লবের আগে মানুষের চিন্তাধারার মুক্তি ও সমালোচনা জরুরি। আর তার জন্য অর্থনৈতিক বিপ্লবের পূর্বে প্রয়োজন সাংস্কৃতিক বিপ্লব সংগঠিত করা।
সুতরাং মার্ক্সীয় তত্ত্বমতে ফ্রাংফুট ঘরানার বুদ্ধিজীবীদের এহেন ভাবাদর্শে বেশকিছু ভালো কথা থকলেও এই দর্শনচিন্তা কেবলই সমাজ বা রাষ্ট্রের উপরিকাঠামো
(Superstructure) কেন্দ্রীক সীমাবদ্ধ। সুতরাং উপরোক্ত আলোচনার নির্মোহ পর্যালোচনা করে নিশ্চয়ই এই সিদ্ধান্তে আসা যায় যে, ফ্রাংফুট ঘরানা বা Frankfurt School দর্শনচিন্তা- মার্ক্সবাদ বিবর্জিত একটি অবৈজ্ঞানিক মতবাদ। কার্যতঃ ফ্রাংফুট ঘরানা- একটি মার্ক্সবাদ বিরোধী প্লাটফর্ম। অতএব সাধু সাবধান!
