বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় মামলা জট এখন এক ভয়াবহ বাস্তবতা। বছরের পর বছর ধরে আদালতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা বেড়েই চলেছে। বিচারপ্রার্থী মানুষ ন্যায়বিচারের আশায় আদালতের দ্বারস্থ হলেও অনেক ক্ষেত্রে বিচার পেতে লেগে যায় দীর্ঘ সময়। ফলে “Justice delayed is justice denied”—এই বহুল প্রচলিত কথাটি বাংলাদেশের বাস্তবতায় আরও গভীর অর্থ বহন করছে। এই পরিস্থিতিতে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি বা Alternative Dispute Resolution (ADR) হতে পারত কার্যকর একটি সমাধান। কিন্তু বাস্তবে বাংলাদেশে ADR এখনও প্রত্যাশিত সফলতা অর্জন করতে পারেনি।
বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (ADR) হলো আদালতের বাইরে পারস্পরিক সমঝোতা, আলোচনা বা নিরপেক্ষ তৃতীয় পক্ষের সহায়তায় বিরোধ মীমাংসার একটি পদ্ধতি। এর মাধ্যমে দ্রুত, কম খরচে এবং তুলনামূলক সহজভাবে বিরোধ নিষ্পত্তি করা সম্ভব। বাংলাদেশে দেওয়ানি, পারিবারিক, বাণিজ্যিক ও শ্রম সংক্রান্ত বিভিন্ন ক্ষেত্রে ADR ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে।
ADR-এর প্রধান পদ্ধতিগুলোর মধ্যে রয়েছে সমঝোতা (Negotiation), মধ্যস্থতা (Mediation), সালিশি (Arbitration), মীমাংসা বা আপস (Conciliation) এবং লোক আদালত বা গ্রামীণ সালিশ। এসব পদ্ধতির মূল উদ্দেশ্য হলো বিরোধকে আদালতের দীর্ঘ প্রক্রিয়ার বাইরে এনে দ্রুত ও শান্তিপূর্ণভাবে নিষ্পত্তি করা।
বর্তমান সময়ে ADR অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে কয়েকটি কারণে। প্রথমত, আদালতে মামলা নিষ্পত্তিতে দীর্ঘ সময় লাগে। ADR-এর মাধ্যমে তুলনামূলক কম সময়ে সমাধান সম্ভব। দ্বিতীয়ত, এতে খরচ কম হয়। আদালতের কোর্ট ফি, দীর্ঘ শুনানি ও আইনজীবীর ব্যয় অনেক ক্ষেত্রেই সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যায়। ADR সেই চাপ কমাতে পারে। তৃতীয়ত, ADR সামাজিক ও পারিবারিক সম্পর্ক রক্ষা করে। আদালতের মামলা প্রায়ই সম্পর্ক নষ্ট করে দেয়, কিন্তু মধ্যস্থতা বা সমঝোতার মাধ্যমে সম্পর্ক বজায় রেখেই বিরোধ নিষ্পত্তি করা সম্ভব হয়।
এছাড়া ব্যবসায়িক বিরোধ নিষ্পত্তিতে ADR-এর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে সালিশি (Arbitration) একটি বহুল স্বীকৃত পদ্ধতি। দ্রুত বিরোধ নিষ্পত্তি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধি করে এবং অর্থনীতিকে গতিশীল রাখে।
কিন্তু এত সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশে ADR প্রত্যাশিতভাবে কার্যকর নয়। এর পেছনে রয়েছে নানা কাঠামোগত, সামাজিক ও মানসিক কারণ।
প্রথমত, সচেতনতার অভাব। দেশের অনেক মানুষ এখনো জানেন না যে আদালতের বাইরে কম খরচে এবং দ্রুত বিরোধ নিষ্পত্তির সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে ADR সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান নেই।
দ্বিতীয়ত, আমাদের সমাজে আদালতমুখী মানসিকতা অত্যন্ত প্রবল। দীর্ঘদিন ধরে মানুষ মনে করে এসেছে যে “আদালতেই প্রকৃত বিচার পাওয়া যায়।” ফলে ADR-কে অনেকেই গুরুত্ব দেন না।
তৃতীয়ত, দক্ষ মধ্যস্থতাকারী ও সালিশকারীর সংকট রয়েছে। ADR সফলভাবে পরিচালনার জন্য প্রশিক্ষিত ও নিরপেক্ষ পেশাজীবী প্রয়োজন। কিন্তু বাংলাদেশে এ ধরনের দক্ষ মানবসম্পদ এখনও সীমিত।
চতুর্থত, আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ADR-এর কার্যকারিতা কমিয়ে দিয়েছে। যদিও দেওয়ানি কার্যবিধি ও পারিবারিক আইনে ADR অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, বাস্তবে অনেক প্রতিষ্ঠানে এর কার্যকর প্রয়োগ নেই। পর্যাপ্ত মনিটরিং, প্রশিক্ষণ ও প্রশাসনিক সহায়তার অভাব রয়েছে।
পঞ্চমত, কিছু ক্ষেত্রে আইনজীবীদের মধ্যেও ADR নিয়ে অনীহা দেখা যায়। কারণ আদালতভিত্তিক দীর্ঘমেয়াদি মামলার তুলনায় ADR দ্রুত শেষ হয়ে যায়, ফলে আর্থিক সুবিধা কমে যেতে পারে—এমন ধারণা অনেকের মধ্যে কাজ করে।
ষষ্ঠত, সামাজিক ও ক্ষমতাগত প্রভাব ADR-এর নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। অনেক সময় শক্তিশালী পক্ষ স্থানীয় সালিশ বা মীমাংসা প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে সক্ষম হয়। এতে দুর্বল পক্ষ আস্থা হারায়।
সপ্তমত, ADR-এর মাধ্যমে হওয়া সমঝোতা বাস্তবায়নে জটিলতা তৈরি হয়। কোনো পক্ষ চুক্তি না মানলে আবার আদালতের দ্বারস্থ হতে হয়। এতে ADR-এর কার্যকারিতা কমে যায়।
বাংলাদেশে ADR-এর গুরুত্ব আরও বেড়েছে অর্থনৈতিক বাস্তবতায়। বর্তমানে বিপুল পরিমাণ ঋণ আদালতে ঝুলে আছে। বছরের পর বছর ধরে মন্দ ঋণ আদায় না হওয়ায় ব্যাংকিং খাত ও অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আদালতে মামলা জট বাড়লেও আদালতের সংখ্যা বা অবকাঠামো সেই হারে বাড়েনি। ফলে বিশাল অঙ্কের অর্থ অনাদায়ী অবস্থায় আটকে আছে, যা অর্থনীতির চাকা মন্থর করে দিচ্ছে। দ্রুত ও কার্যকর ADR ব্যবস্থা চালু করা গেলে এই চাপ অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
বাংলাদেশে ADR কার্যকর করতে হলে কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে। জনগণের মধ্যে ব্যাপক সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। বিচারক, আইনজীবী ও মধ্যস্থতাকারীদের বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। ইউনিয়ন ও স্থানীয় পর্যায়ে ADR কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে। ADR চুক্তি বাস্তবায়নে শক্তিশালী আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি ডিজিটাল ও অনলাইন মধ্যস্থতা চালু করলে আধুনিক ও দ্রুত বিরোধ নিষ্পত্তির সুযোগ তৈরি হবে।
সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে ADR বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার ওপর চাপ কমাতে, ব্যবসা-বাণিজ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনতে এবং সাধারণ মানুষের দ্রুত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সময়ের প্রয়োজনেই বাংলাদেশকে এখন কার্যকর ADR ব্যবস্থার দিকে আরও গুরুত্ব সহকারে এগিয়ে যেতে হবে।
লেখক
কাজী মাহমুদুর রহমান
চিফ লিগ্যাল অফিসার, ইউনিয়ন ব্যাংক পিএলসি
ই-মেইল: qazi.mahmudur@gmail.com
