বাংলাদেশে খাদ্য ভেজাল এখন এক নীরব মহামারীতে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন আমরা যে খাবার গ্রহণ করছি, তার কতটুকু নিরাপদ—এই প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর আজও অনিশ্চিত। বাজার থেকে শুরু করে রান্নাঘর পর্যন্ত, খাদ্যের প্রতিটি ধাপে লুকিয়ে আছে ভেজালের ছোঁয়া।
সচেতনতা বাড়াতে বিভিন্ন সময় নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা, পত্রিকায় প্রতিবেদন, এমনকি ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানও চোখে পড়ে। তবুও বাস্তবতা হলো—খাদ্য দূষণ কমছে না, বরং বিস্তৃত হচ্ছে শহর থেকে গ্রামে।
ভেজালের বিস্তার: এক অদৃশ্য চক্র:
খাদ্য ভেজাল কোনো একক ধাপে ঘটে না; এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। কৃষি পর্যায়ে অতিরিক্ত কীটনাশক ও রাসায়নিকের ব্যবহার দিয়ে এর সূচনা। এরপর সংরক্ষণে ফরমালিনসহ ক্ষতিকর পদার্থ প্রয়োগ করা হয়। হোটেল-রেস্তোরাঁয় খাদ্য প্রস্তুতের সময় যুক্ত হয় আরও ভেজাল। শেষ পর্যন্ত ভোক্তার হাতে পৌঁছানোর আগেই খাদ্য হয়ে ওঠে বিষাক্ত।
আইন আছে, প্রয়োগ নেই:
খাদ্য ভেজাল প্রতিরোধে দেশে একাধিক আইন রয়েছে—দণ্ডবিধি ১৮৬০, বিশেষ ক্ষমতা আইন ১৯৭৪, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯, নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩ এবং ফরমালিন নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১৫। এসব আইনে কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড এমনকি মৃত্যুদণ্ডের বিধানও আছে। ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে (The Special Powers Act, 1974) খাদ্য বা পানীয়তে ভেজাল মেশানো এবং ভেজাল খাদ্য বিক্রির বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। আইনের ২৫(গ) (25C) ধারায় খাদ্য ভেজাল সংক্রান্ত অপরাধের বিচার ও শাস্তির কথা উল্লেখ আছে।
১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে খাদ্য ভেজাল নিয়ে যা বলা হয়েছে:
- সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড: যদি কেউ জেনেশুনে খাদ্য বা পানীয়তে এমন ভেজাল মেশায়, যা মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর (Noxious) বা খাবারের অযোগ্য (Unfit) করে তোলে, অথবা এরূপ ভেজাল খাদ্য বিক্রি বা বিক্রির জন্য প্রদর্শন করে, তবে সে ব্যক্তি মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হতে পারে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—এসব আইনের বাস্তব প্রয়োগ কতটা? আইন প্রনয়ের পর থেকে এখন পর্যন্ত উক্ত আইনের কঠোর শাস্তি মৃত্যুদন্ড প্রদানের নজির পাওয়া যায় নাই। ফলে আইন যেন কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ, বাস্তব প্রয়োগে তার “মিউ মিউ” স্বর ছাড়া আর কিছু শোনা যায় না।
শাস্তি নাকি সচেতনতা—কোনটি বেশি জরুরি?
অনেকে মনে করেন, কঠোর শাস্তি—এমনকি মৃত্যুদণ্ড—প্রয়োগ করলে ভেজাল বন্ধ হবে। আবার অন্যদের মতে, সমস্যা শুধু আইনের কঠোরতায় নয়, বরং তার কার্যকর প্রয়োগে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—সামাজিক মানসিকতা। আমরা অনেকেই ভেজালকে অপরাধ হিসেবে দেখি না; বরং ‘স্বাভাবিক’ হিসেবে মেনে নিয়েছি। এই মানসিকতা পরিবর্তন না হলে কোনো আইনই কার্যকর হবে না।
ধর্মীয় ও নৈতিক দৃষ্টিকোণ বিষয়ে সচেতনতা
ইসলাম ধর্মে ভেজালকে স্পষ্টভাবে প্রতারণা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সত্য গোপন করা এবং প্রতারণার মাধ্যমে উপার্জনকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তাই খাদ্য ভেজাল শুধু আইনি অপরাধ নয়, এটি নৈতিক ও ধর্মীয় বিচ্যুতিও।
সমাধানের পথ কোথায়?
খাদ্য ভেজাল রোধে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। প্রথমত, বিদ্যমান আইনের কঠোর ও নিয়মিত প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইন (The Special Powers Act, 1974) অনুসারে ভেজার প্রদানকারী বা প্রদানকারীদের মৃত্যুদন্ড প্রদান করতে হবে। দ্বিতীয়ত, ভোক্তাদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে।তৃতীয়ত, সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধ জাগ্রত করতে হবে।
খাদ্য ভেজাল কোনো সাধারণ সমস্যা নয়—এটি মানুষের জীবন ও ভবিষ্যতের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে, এই নীরব বিষ আমাদের সমাজকে আরও গভীর সংকটে ঠেলে দেবে।
— লেখক
ইভিপি এন্ড চিফ লিগ্যাল অফিসার (সিএলও), ইউনিয়ন ব্যাংক পিএলসি,
qazi,mahmudur@gmail.com
