সাম্প্রতিক সময়ে এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক এবং ইউনিয়ন ব্যাংকের সম্পদ ও দায়-দেনা ‘শরীয়াহভিত্তিক সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি’-র মাধ্যমে গৃহীত হওয়ার পর ব্যাংকিং খাতে এক নজিরবিহীন যুগান্তকারী পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু এই রূপান্তরের পেছনে যে কতটা কঠোর আইনগত ঝুঁকি ঝুলছে, তা অনেকেই টের পাচ্ছেন না। ব্যাংক রেজল্যুশন আইন, ২০২৬ কেবল একটি সাধারণ প্রশাসনিক আইন নয়—এটি ব্যাংক খাতের দুর্নীতিবাজ ও অবহেলাকারী কর্মকর্তা-পরিচালকদের জন্য এক নির্মম আইনি মারণাস্ত্র।
আইনটির ৫৯ ও ৬০ ধারার বিধানগুলো জানলে যে কারও বুকের ভেতর কাঁপন ধরে যেতে পারে। সামান্যতম অবহেলা বা অতীতের একটি ভুল সিদ্ধান্ত আপনাকে সরাসরি দীর্ঘমেয়াদের কারাদণ্ড এবং সর্বস্বান্ত হওয়ার মুখে ঠেলে দিতে পারে। আইনটির ৫৯ (১/গ/অ/ই) –তে অপরাধের সঙ্গা দেয়া হয়েছে- অস্থায়ী প্রশাসন ও রেজল্যুশনের আওতাধীন অথবা অবসায়নাধীন কোনো তফসিলি ব্যাংকের পরিচালক অথবা কর্মকর্তা দ্বারা সংঘটিত অপরাধী তিনি যিনি– উক্ত তফসিলি ব্যাংকের (৫টি হস্তান্তরকারী ব্যাংক) সম্পত্তি অথবা বিষয় সম্পর্কিত কোনো বহি, রেজিস্টার, রেকর্ড বা দলিলপত্র গোপন, ধ্বংস, বিকৃত অথবা জাল করিয়াছেন, অথবা উহাতে সহযোগিতা করিয়াছেন।
কীভয়াবহবিপদএকটুভেবেদেখুন:
- অজ্ঞাতসারেই অপরাধী: আপনি হয়তো ব্যাংকের একজন সাধারণ নির্বাহী বা অফিসার ছিলেন। ভেবেছেন আপনার ওপর সরাসরি কোনো দোষ বর্তাবে না। কিন্তু আইন বলছে, কোম্পানি অপরাধ করলে তৎকালীন প্রত্যেক পরিচালক, নির্বাহী কর্মকর্তা বা অফিসার বা সচিব ব্যক্তিগতভাবে দায়ী থাকবেন! আপনি জানতেন না—এই সাফাই আদালত সহজে গ্রহণ করবে না যদি না আপনি প্রমাণ করতে পারেন যে আপনি চরম সতর্কতা অবলম্বন করেছিলেন।
- ১২ মাস আগের হিসাবের ঝুঁকি: রেজল্যুশন বা অবসায়ন শুরু থেকে ১২ মাসের মধ্যে ব্যাংকের সামান্যতম সম্পত্তি, ঋণ বা হিসাবের এদিক-সেদিক হয়েছে কি? যদি নথিপত্র একটুও এদিক-সেদিক করা হয়ে থাকে কিংবা কোনো ভুয়া বা অস্পষ্ট তথ্য থেকে থাকে, তবে আপনি সরাসরি ফৌজদারি অপরাধের মুখে পড়বেন।
- ৫ বছরের দীর্ঘ তদন্তের জালে বন্দি: আপনি গত ৫ বছরের মধ্যে ব্যাংকের কোনো পাওনাদারের সাথে দেনদরবার করেছেন? কোনো ক্ষতি বা ব্যয়ের হিসাব দেখিয়েছেন? সামান্যতম গরমিল বা কল্পিত ক্ষতির হিসাব প্রমাণিত হলেই আপনার বিরুদ্ধে প্রতারণার খড়্গ নেমে আসবে।
- অন্যের অপরাধের দায় নিজের ঘাড়ে: ব্যাংকের কোনো সম্পত্তি কেউ অবৈধভাবে বন্ধক রেখেছে বা স্থানান্তর করেছে, আর আপনি তাতে কোনোভাবে যুক্ত ছিলেন বা চোখ বন্ধ করে ছিলেন? তবে আপনিও রেহাই পাচ্ছেন না। আইন অনুযায়ী সেই সম্পত্তির সাথে জড়িত যে কেউ অপরাধী হিসেবে গণ্য হবেন।

অপরাধ ও দন্ডে বর্ননা দেয়া হয়েছে ধারা : ৬৩। (১) কোনো ব্যক্তি এই আইনের ধারা ৫৯ এর উপ–ধারা (১) এর দফা (গ) এর উপ–দফা (অ), (ই), (ঈ), (উ) এবং (ঘ), (চ), (ছ) ও (জ) এর আওতায় কোনো অপরাধ করিলে, উক্ত অপরাধের কারণে তিনি অনধিক ১ (এক) কোটি টাকা জরিমানা অথবা অনধিক ৭ (সাত) বৎসর কারাদণ্ড, অথবা উভয় প্রকার দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন। (২) উপ–ধারা (১) এর অধীন কোনো অপরাধ সংঘটিত হইলে প্রশাসক বা অবসায়ক বা রেজল্যুশনের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক মনোনীত কোনো ব্যক্তি, অথবা, প্রযোজ্য ক্ষেত্রে, বাংলাদেশ ব্যাংক উপযুক্ত আদালতে অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনগত কার্যক্রম শুরু করিতে পারিবে।”
আতঙ্কিত হোন, তবে পলায়নপর নয়—সতর্ক হোন!
এই কঠোর আইনের বিধানগুলো শোনার পর আতঙ্কিত হওয়াই স্বাভাবিক। তবে এই আতঙ্ক যেন আপনাকে পঙ্গু না করে, বরং আপনার মধ্যে ত্বরিত সতর্কতা তৈরি করে। আপনার পেশাগত ও আইনি সুরক্ষার জন্য এখনই যা করা জরুরি:
১. সব নথিপত্র নিখুঁত করুন: আপনার অধীনে থাকা বা অতীতে তত্ত্বাবধান করা সমস্ত স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির বিবরণ, রেজিস্টার, এবং দলিলপত্র পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করে নিন। কোনো রকম গরমিল বা ফাঁকফোকর যেন না থাকে।
২. তথ্য লুকানোর চেষ্টাকরবেন না: বাংলাদেশ ব্যাংক, প্রশাসক বা অবসায়কের যেকোনো চাওয়া বা নির্দেশকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিন। সামান্য তথ্য গোপন করার চেষ্টা বা টালবাহানা আপনার জীবনকে ধ্বংস করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
৩. দায়িত্বে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা আনুন: আপনার শাখাতে বা দপ্তরে বা কর্মপরিধিতে কোনো অনিয়ম বা ভুয়া লেনদেন হচ্ছে কি না তা কড়া নজরদারিতে রাখুন। সন্দেহজনক কিছু দেখলেই তাৎক্ষণিকভাবে লিখিতভাবে উচ্চ কর্তৃপক্ষকে অবহিত করুন, যাতে ভবিষ্যতে আইনি সুরক্ষায় এটি আপনার ঢাল হিসেবে কাজ করে।
মনে রাখবেন: আইন কাউকে ছাড় দেয় না। আজকের এই কঠোর বাস্তবতাকে ভয় পেয়ে নয়, বরং চরম সতর্কতা এবং নিখুঁত আইনি সচেতনতার মাধ্যমেই কেবল আপনি আপনার চাকরি, সম্মান এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতা রক্ষা করতে পারবেন। সময় ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই নিজের কর্মস্থল ও দাপ্তরিক কাজকর্মে শতভাগ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করুন!
লেখক-
কাজী মাহমুদুর রহমান,
ই্ভিপি ও চিফ লিগ্যাল অফিসার – কমার্শিয়াল ব্যাংক।
