গত ৯ অক্টোবর পালিত হলো চে গুয়েভারার মৃত্যুবার্ষিকী। মাত্র ৩৯ বছরের জীবনে চে সমগ্র পৃথিবীতে একটি ঝাঁকুনি দিয়ে গেছেন। ৯ তারিখ বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাবেক সাধারণ সম্পাদক কমরেড মোহাম্মদ ফরহাদেরও মৃত্যুবার্ষিকী ছিল। যিনি মাত্র ৪৯ বছরের জীবনে সমগ্র দেশে রাজনৈতিক অঙ্গনে বিপুল প্রভাব বিস্তার করেছিলেন। এই ৯ তারিখ আরেকজন ক্ষণজন্মা শিল্পী জন লেননের জন্মদিন যিনি মাত্র ৪০ বছর কাল এই পৃথিবীতে বিচরণ করেছেন। যিনি গানে গানে বৈষম্য, ক্ষুদা, দারিদ্র মুক্ত পৃথিবীর কল্পনা করেছিলেন।
অগ্রজদের কাছ থেকে যতটুকু শুনেছি কমরেড ফরহাদ একজন ক্যারিশমাটিক নেতা ছিলেন। তিনি একটি বড় ঐক্যবদ্ধ পার্টির নেতৃত্ব দিয়েছেন। যেই পার্টির শক্তিশালী গণভিত্তি ছিল। পার্টির সদস্যরা যেই গণসংগঠনগুলোতে কাজ করতেন সেই গণসংগঠনগুলোর বিস্তৃতি ছিল সমগ্র দেশব্যাপী। পার্টির পত্রিকার গ্রাহক সংখ্যাও ছিল অনেক। শ্রমিক, ক্ষেতমজুর, ছাত্রদের আন্দোলণে ৮০ দশকে সমগ্র দেশ প্রকম্পিত হচ্ছিলো। নতুন প্রজন্মকে তিনি স্বপ্ন দেখাতে পেরেছিলেন। তিনি স্বপ্ন দেখাতে সমর্থ হয়েছিলেন যে বাংলাদেশে অচিরেই বিপ্লব হবে। পৃথিবীতে জন্মগ্রহণকারী এমন কোনো ব্যক্তি আছে কি যিনি সমালোচনার উর্ধে? কমরেড ফরহাদেরও কিছু রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের সমালোচনা আমরা শুনতে পাই। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে বাকশালে সিপিবির যোগদানে ভূমিকা রাখা, আফগান স্টাইলে বিপ্লবের ঘোষণা দেয়া, সংসদে হাসিনা ও খালেদা কে ১৫০ টি করে আসনে নির্বাচন করার প্রস্তাব প্রদান। সম্ভবত ৮০ দশকের শুরুতে সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তানে সৈন্য প্রেরণ করে। যদিও এই বিষয়ে সোভিয়েতপন্থী আফগান সরকারের সাথে সোভিয়েত ইউনিয়নের সমঝোতা ছিল। কিন্তু সমালোচকদের বক্তব্য মার্ক্সবাদ লেনিনবাদ কখনো একটি দেশ দখল করে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা সমর্থন করে না। সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করবে সেই দেশের শোষিত বঞ্চিত মানুষ, শ্রমিকশ্রেণির পার্টির নেতৃত্বে। উপরোক্ত বিষয়ে অনেকে ফরহাদ ভাই-এর সমালোচনা করলেও আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি না ফরহাদ ভাই ভুল কিছু করেছেন। কারণ ফরহাদ ভাই সোভিয়েতপন্থী একটি কমিউনিস্ট পার্টির নেতা ছিলেন। সোভিয়েত ইউনিয়নের অনেক সুযোগ সুবিধা তখন কমিউনিস্ট পার্টির নেতা কর্মীরা পেয়ে থাকেন। ৬০ এর দশকে সমগ্র পৃথিবীর কমিউনিস্ট পার্টিগুলো দুটি শিবিরে বিভক্ত হয়ে পরে। যা শোষিতের সংগ্রাম কে ক্ষতিগ্রস্থ করে। কিন্তু বিভাজন কি নিয়ে ছিল সেই বিষয়টা খুব কম বক্তার মুখেই শুনেছি। যতটুকু জানার সুযোগ হয়েছে সেই অনুযায়ী, স্তালিন উত্তরকালে, নিকিতা ক্রুশ্চেভ যখন ক্ষমতায় তখন সোভিয়েত পার্টি ঘোষণা করলো এখন শান্তিপূর্ণ সহবস্থান, শান্তিপূর্ণ প্রতিযোগিতা এবং জাতীয় বুর্জোয়াদের সাথে নিয়ে শান্তিপূর্ণ উত্তরণের মাধ্যমে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব এবং আরো ঘোষণা করলো সোভিয়েত পার্টি হবে সমগ্র জনগণের অর্থাৎ কেবল শ্রমিক শ্রেণির নয়। সোভিয়েত পার্টির এই ঘোষনার বিপরীতে মতাদর্শিক লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিলো চীনের কমিউনিস্ট পার্টি। চীনের কমিউনিস্ট পার্টি ঘোষণা করলো সুনির্দিষ্ট লাইন ও কর্মপন্থা নির্ধারণের সঙ্গে প্রতিটি কমিউনিস্ট ও ওয়ার্কার্স পার্টির নিজ নিজ দেশে বিপ্লব ও গঠনকার্যের সঙ্গে মার্ক্সবাদ লেনিনবাদের সর্বাঙ্গীন সত্যগুলোর সমন্বয় সাধন করতে হবে। আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের লাইন নির্ধারণের জন্য প্রয়োজন বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতির বাস্তব পরিস্থিতির শ্রেণীগত বিশ্লেষণ। চীনের কমিউনিস্ট পার্টি ঘোষণা করলো সোভিয়েত পার্টির এই লাইন সমাজতন্ত্রিক শিবির ও সাম্রাজ্যবাদী শিবিরের মধ্যেকার দ্বন্দ্বের শ্রেণীগত মর্মবস্তু অস্বীকার করে। সর্বহারা শ্রেণি ও পুঁজিপতি শ্রেণির মধ্যকার দ্বন্দ্বগুলো শান্তিপূর্ণ উপায়ে নিরসন সম্ভব নয়। মাও সেতুং বললেন সমাজতান্ত্রিক সমাজেও শ্রেণি সংগ্রাম থাকে, শ্রেণি থাকে। তাই শেণিসংগ্রাম কে ভুল না। তোমরা যদি বুর্জোয়াদের খুঁজে না পাও তাহলে পার্টির মধ্যেই খোঁজ করো যেখানে অনেককেই পাবে বুর্জোয়াদের চিন্তা চেতনায় আচ্ছন্ন। সোভিয়েত ঘোষনার সমালোচানা করার ফলশ্রুতিতে চীন বিপ্লবের পর সোভিয়েত ইউনিয়ন চীনে যে বিপুল বিনিয়োগ করেছিল অবকাঠামোগত উন্নয়নে তা সব তুলে নিলো। প্রকৌশলীদের দেশে ফেরত নিয়ে আসলো। কমিউনিস্ট পার্টিগুলোর আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সম্মেলনে সোভিয়েত পার্টি চীনের পার্টির বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ ও বিষোদাগার করলো। কমিউনিস্ট আন্দোলনে এই ধরণের বিতর্ক নতুন কিছু নয়। মার্কস এঙ্গেলস এর যুগে এঙ্গেলসের বন্ধু বার্নস্টাইন ঘোষণা দিয়েছিলেন সর্বহারাদের বিপ্লবী সমাজতন্ত্রী কার্যক্রম ত্যাগ করা উচিত এবং প্রচলিত সমাজ ব্যাবস্থার মধ্যে শান্তিপূর্ণ শ্রমিক সংগঠনমূলক ক্রিয়াকলাপে নিযুক্ত থাকা উচিত। তিনি ১৯০১ সালে মার্ক্সবাদের ব্যাপক সংশোধনের কথা বলেন। এর থেকেই ‘সংশোধনবাদ’ শব্দটির উদ্ভব। লেনিন কে লড়াই করতে হয়েছিল কাউটস্কির বিরুদ্ধে যার তত্ত্বের তাৎপর্য ছিল যে পুঁজিবাদের মধ্যেও স্থায়ী শান্তি আসতে পারে। উল্লেখ্য যে, ক্রুশ্চেভের সময় থেকে বিভিন্ন সামাজিক খাতে ব্যক্তিমালিকানা ফেরার ক্ষেত্র প্রস্তুত করা হয়। বিষয়ের ও সেই সময়ের বিশ্ব পরিস্থিতির গভীরে প্রবেশ না করে ৬০ দশকের বিতর্ক নিয়ে মূল্যায়ন করা আমার জন্য কঠিন। অনেকে ভাবতে পারেন ২য় বিশ্বযুদ্ধের কঠিন পরিস্থিতি হয়তো তৎকালীন সোভিয়েত পার্টি কে এই ধরণের ঘোষণার ক্ষেত্রে প্ররোচিত করে থাকতে পারে, কারণ ২য় বিশ্বযুদ্ধে সবচাইতে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন। তবে মজার বিষয় হচ্ছে মাও সেতুং এর মৃত্যুর পর যারা চীনের ক্ষমতা দখল করেছিল তারা নিজেরাও সোভিয়েত ওই লাইন দ্বারা প্রভাবিত ছিল। যেই সোভিয়েত ইউনিয়নের জনগণ বলশেভিক বিপ্লবের পর জীবন দিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন কে রক্ষা করেছিল, যে সোভিয়েত জনগণ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জীবন দিয়ে পৃথিবীকে ফ্যাসিজম এর হাত থেকে মুক্ত করলো সেই সোভিয়েত ইউনিয়ন ৯১ সালে তাসের ঘরের মতো ভেঙ্গে গেলো, তার পিছনে কি ওই ৬০ এর ঘোষনার কোনো প্রভাব ছিল? সোভিয়েত পন্থী পার্টিগুলোই কেন একে একে বিলুপ্ত হয়ে গেলো? আবার এই সোভিয়েত ইউনিয়নই কিন্তু ৬০ ও ৭০ দশকে নিপীড়িত জাতিগুলোর মুক্তি সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। চীন অবস্থান নিয়েছিল পাকিস্তান রাষ্ট্রের পক্ষে।
তাই আমরা যদি ফরহাদ ভাই এর সময় সোভিয়েত পার্টির লাইন বিবেচনা করি, তাহলে বাকশালে যোগদান, আফগান স্টাইলে বিপ্লব কিংবা সংসদে হাসিনা ও খালেদা কে ১৫০ টি করে আসন প্রদানের প্রস্তাব কোনোটাই ভুল ছিল না। সোভিয়েত ইউনিয়ন তখন জাতীয় বুর্জোয়াদের সাথে সহাবস্থানের মাধ্যমে সমাজতন্ত্রে উত্তরণের কথা বলছে। তবে এটা ঠিক কেউ প্রশ্ন করতেই পারে ফরহাদ ভাইয়ের ওই সকল সিদ্ধান্ত মার্ক্সবাদ লেনিনবাদ কে সমর্থন করে কিনা? লেনিন নিজেই দেখিয়ে গেছেন গণতান্ত্রিক বিপ্লবে শ্রমিক শ্রেণিকেই নেতৃত্ব দিতে হব। বুর্জোয়ারা তাদের জাতীয় চরিত্র হারিয়ে ফেলেছে। লেনিন দেখিয়ে গেছেন বিদ্যমান ব্যবস্থা গণতন্ত্রের আড়ালে বুর্জোয়া এক নায়কতন্ত্র। কেবল শ্রমিকশ্রেণির একনায়কতন্ত্র দ্বারাই এর প্রতিস্থাপন সম্ভব। আমরা এটাও জানি যে মার্কসবাদের মর্মবস্তু হচ্ছে- বাস্তব পরিস্থিতির বাস্তব বিশ্লেষণ।
