একটি ব্যাংকের প্রাণভোমরা হলো তার বিনিয়োগ বা ঋণ। আর সেই ঋণ যখন খেলাপির খাতায় নাম লেখায়, তখন শুরু হয় আইনি লড়াই। কিন্তু ভাবুন তো, মাঠপর্যায়ের শাখা কর্মকর্তাদের চরম গাফিলতি বা অলসতার খেসারত যদি দিতে হয় খোদ ব্যাংকের ম্যানেজিং ডিরেক্টর (এমডি) বা শীর্ষ ম্যানেজমেন্টকে? শুনতে অদ্ভুত লাগলেও, বাংলাদেশের অর্থঋণ আদালত আইন–২০০৩ এর ৪৬ ধারা ঠিক এই চাবুকটিই উঁচিয়ে রেখেছে শীর্ষ নির্বাহীদের ঘাড়ে।
সম্প্রতি একটি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের বারবার তাগাদা সত্ত্বেও শাখা পর্যায়ে মামলা দায়েরের ধীরগতিতে ম্যানেজমেন্ট তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। আর এই অসন্তোষের আড়ালেই লুকিয়ে আছে এক চরম আইনি বিপর্যয়, যা যেকোনো মুহূর্তে একজন এমডি বা প্রধান নির্বাহীকে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিতে পারে।
৪৬ ধারার অমোঘ বাণ!
সাধারণত আমরা জানি, মামলা করতে দেরি হলে ব্যাংকের টাকা আদায় ঝুলে যায়। কিন্তু অর্থঋণ আদালতের ৪৬ ধারা বলছে অন্য কথা। তামাদি আইনের সাধারণ নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এই ধারা স্পষ্ট করে দিয়েছে নির্দিষ্ট টাইমলাইন:
- ১ম বছরের প্রাপ্য টাকার অন্তত ১০%, অথবা ২য় বছরের ১৫%, অথবা ৩য় বছরের ২৫% আদায় না হলে পরবর্তী ১ বছরের মধ্যে মামলা ঠুকতেই হবে।
- ৩ বছরের কম মেয়াদি ঋণের ক্ষেত্রে যদি ২০% আদায় না হয়, তবে মেয়াদ শেষের ১ বছরের মধ্যে মামলা দায়ের বাধ্যতামূলক।
এখন প্রশ্ন হলো, এই সময়সীমার মধ্যে মাঠপর্যায়ের শাখা বা উপ-শাখা যদি মামলা করতে ব্যর্থ হয়, তবে কী ঘটবে?
দায় কার? শাখার নাকি প্রধান নির্বাহীর?
৪৬ (৫) উপ-ধারাটি পড়লে যেকোনো সচেতন এমডি বা প্রধান নির্বাহীর কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়তে বাধ্য। আইন বলছে—নির্দিষ্ট মেয়াদের পর কোনো মামলা দায়ের করা হলে, আদালত কালবিলম্ব না করে সরাসরি ওই আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী বা এমডি–কে লিখিতভাবে জানাবেন।
আইন আরও কঠোর: মামলা কেন সময়মতো হলো না, তার জন্য দায়ী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়ে ৯০ দিনের মধ্যে আদালত ও সরকারকে জানাতে হবে।
সবচেয়ে সুপ্ত ও ভয়ঙ্কর সত্যটি হলো—যদি এই গাফিলতির কারণে মামলা তামাদি হয়ে যায় (অর্থাৎ আইনি কার্যকারিতা হারায়), তবে ব্যাংকের টাকা আদায়ের পথ যেমন রুদ্ধ হয়, তেমনি আইনগতভাবে ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ (MD) ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের শাস্তিযোগ্য অপরাধে দণ্ডিত হওয়ার পথ সুগম হয়ে যায়। মাঠপর্যায়ের একজন কর্মকর্তার আলসেমি বা ফাইল চেপে রাখার চূড়ান্ত দায় গিয়ে পড়ে এমডির ডেস্কে!
“শাখা কর্মকর্তাদের মনে রাখা উচিত, আইনি অবহেলার কারণে যদি মামলা তামাদি হয়ে যায়, তবে এর সমস্ত আর্থিক ও আইনি দায়ভার কিন্তু ব্যক্তি হিসেবে তাদের ওপরেই বর্তাবে। পর্ষদের নির্দেশ অমান্য করার পরিণতি কখনো সুখকর হয় না।“
সমাধান কোথায়? ‘ফায়ার ফাইটিং‘ নাকি প্রো–অ্যাক্টিভ লিগ্যাল উইং?
অধিকাংশ ব্যাংকের লিগ্যাল ডিপার্টমেন্ট বা আইন বিভাগ কাজ করে ‘পোস্ট-মর্টেম’ এজেন্সির মতো। অর্থাৎ, শাখা থেকে ফাইল আসার পর তারা নড়েচড়ে বসে। কিন্তু বর্তমান কর্পোরেট বাস্তবতায় এই সংস্কৃতি আমূল বদলাতে হবে।
টাকা আদায় হোক বা না হোক, আইনি মারপ্যাঁচে যেন ম্যানেজমেন্টের কোনো ক্ষতি না হয়, সেজন্য ব্যাংকে একটি ‘প্রো–অ্যাক্টিভ ও অটোমেটেড লিগ্যাল অ্যালার্ট সিস্টেম‘ থাকা জরুরি। এমন একটি শক্তিশালী আইন বিভাগ প্রয়োজন যা: ১. শাখাগুলোর জন্য শুধু অপেক্ষা করবে না, বরং সেন্ট্রাল ডেটাবেজ থেকে কোন ঋণটি ৪৬ ধারার ডেডলাইনে পড়তে যাচ্ছে, তা আগেভাগেই স্ক্রিনে দেখাবে। ২. আইন লঙ্ঘনের বা ডেডলাইন মিস হওয়ার আগেই ম্যানেজমেন্ট এবং সংশ্লিষ্ট শাখাকে রেড অ্যালার্ট বা ‘কড়া সতর্কবার্তা’ পাঠাবে।
বোর্ডের নির্দেশ উপেক্ষা করে বছরের পর বছর ফাইল আটকে রাখার সংস্কৃতি যারা লালন করছেন, তারা প্রকারান্তরে এমডির চেয়ারের নিচে টাইম-বোমা ফিট করছেন। শীর্ষ ম্যানেজমেন্টের এখন সময় এসেছে চোখ কান খোলা রাখার। কারণ, শাখা ম্যানেজারের টেবিলের ধুলো জমা ফাইলটি যখন আদালতে তামাদি বলে গণ্য হবে, তখন আদালতের সমনটি কিন্তু কোনো শাখার ঠিকানায় যাবে না; সেটি সরাসরি পৌঁছাবে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের এমডির সুশোভিত কক্ষে।
চিন্তাটা তাই আজই শুরু করা দরকার—আগামীকাল হয়তো বড্ড দেরি হয়ে যাবে!
লেখক:
কাজী মাহমুদুর রহমান, চিফ লিগ্যাল অফিসার,
ইউনিয়ন ব্যাংক
