দেশের ব্যাংক খাতে চলমান সংকটকে কেন্দ্র করে পাঁচটি দুর্বল ব্যাংক একীভূতকরণের উদ্যোগ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মহলের একাংশ এই প্রক্রিয়াকে আখ্যা দিচ্ছেন “মার্জার” নয়, বরং “ইঁদুরের রুটি বিতরণ”—যেখানে প্রকৃত মালিক ও আমানতকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী লাভবান হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ, ২০২৫—যা আন্তর্জাতিক সংস্থার পরামর্শে প্রণীত বলে দাবি করা হয়—এর আওতায় সংকটাপন্ন ব্যাংকগুলোর পুনর্গঠন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। অধ্যাদেশ অনুযায়ী, শেয়ারহোল্ডার, সাবঅর্ডিনেটেড ঋণধারকসহ বিভিন্ন পক্ষের ওপর লোকসান আরোপের বিধান রাখা হয়েছে। এর ফলে অনেক ক্ষেত্রে শেয়ারহোল্ডারদের বিনিয়োগ কার্যত শূন্যে নেমে এসেছে।
অন্যদিকে, আমানতকারীদের সুরক্ষা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। অধ্যাদেশে আমানতের পূর্ণ নিরাপত্তা নিয়ে স্পষ্ট কোনো নির্দেশনা না থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, আন্তর্জাতিক কনসালটিং প্রতিষ্ঠানের সম্পদ গুণগতমান পর্যালোচনায় (AQR) দেখা গেছে—আলোচ্য পাঁচ ব্যাংকের নিট সম্পদ মূল্য (NAV) ঋণাত্মক। এ প্রেক্ষিতে ব্যাংকিং সেক্টর ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট কমিটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, রেজল্যুশন প্রক্রিয়ায় শেয়ারহোল্ডারদেরই ক্ষতির দায়ভার বহন করতে হবে।
তবে এ সংকটের পেছনে ব্যবস্থাপনাগত ব্যর্থতা ও উদ্দেশ্যমূলক সিদ্ধান্তের অভিযোগও ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, বিগত সময়ে একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করে নিজেদের অনুগত ব্যক্তিদের বসিয়েছে এবং ধীরে ধীরে ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম দুর্বল করে ফেলেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত প্রায় ২০ মাসে নতুন বোর্ড ব্যাংকগুলোর আয় বাড়াতে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। বরং ঋণ বিতরণ স্থগিত, বিভিন্ন সেবা সীমিত করা এবং বিপুলসংখ্যক গ্রাহককে ঋণখেলাপি হিসেবে শ্রেণিকরণের মতো “ফিন্যানসিয়াল কু” সিদ্ধান্ত ব্যাংকগুলোর নগদ প্রবাহ কমিয়ে দিয়েছে। ফলে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৬০ কোটি টাকার লোকসান গুনতে হচ্ছে এসব ব্যাংককে।
এদিকে, কাউন্টারে গিয়ে আমানতকারীরা অর্থ উত্তোলনে বাধার মুখে পড়ছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে, যা ব্যাংকিং খাতে আস্থার সংকট আরও বাড়িয়ে তুলেছে। ইতোমধ্যে বিগত ২০ মাসে পাঁচ ব্যাংকের সম্মিলিত ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৫৪ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে বলে ধারনা করছে অনেকে। এর দায় বিগত অযোগ্য ইনডিপেন্ডেন্ট বোর্ড এড়াতে পারবে না বলে অনেকে মনে করেন। বিজনেস বন্ধ রেখে মার্জার প্রক্রিয়াও একটি অপরাধ বলে দাবি করেন কোন কোন আমানতকারী।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা রক্ষায় দ্রুত জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী ও আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই সংকট আরও গভীর হতে পারে।
সব মিলিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—এই মার্জার কি সত্যিই পুনরুদ্ধারের পথ, নাকি এর আড়ালে চলছে ভিন্ন কোনো হিসাব? লেখক: গৌরাঙ্গ শাহ, ফাইন্যান্সিয়াল এনালিস্ট ও আইনবিদ।
